Opinion & Feedback
কুরআনুল কারীম বিশ্ব মানবতার জন্য এক অফুরন্ত নিয়ামাত। আল্লাহ তা‘আলার বড়ই মেহেরবানী যে, তিনি আমাদের উপর কুরআন অবতীর্ণ করেছেন। আর কুরআন এমন একটি কিতাব যার মাধ্যমে আরবের সেই জাহেলী জাতি সৌভাগ্যবান জাতিতে পরিণত হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন দিয়েই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ তৈরি করেছিলেন। এটি এমন এক কিতাব, যার সম্পর্কে সকলেরই জ্ঞান থাকা আবশ্যক। নিম্নে কুরআনের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হলো।কুরআনুল কারীম বিশ্ব মানবতার জন্য এক অফুরন্ত নিয়ামাত। আল্লাহ তা‘আলার বড়ই মেহেরবানী যে, তিনি আমাদের উপর কুরআন অবতীর্ণ করেছেন। আর কুরআন এমন একটি কিতাব যার মাধ্যমে আরবের সেই জাহেলী জাতি সৌভাগ্যবান জাতিতে পরিণত হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন দিয়েই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ তৈরি করেছিলেন। এটি এমন এক কিতাব, যার সম্পর্কে সকলেরই জ্ঞান থাকা আবশ্যক। নিম্নে কুরআনের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হলো।
আল-কুরআন কী
এক. কুরআন আল্লাহর কিতাব : আল্লাহ তা‘আলা যুগে যুগে মানবতার হিদায়াতের জন্য অসংখ্য কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। আলকুরআন হলো সর্বশেষ কিতাব, যা বিশ্বমানবতার জন্য আল্লাহ অবতীর্ণ করেছেন। কুরআনুল কারীমে বলা হয়েছে।
وَإِنَّهُ لَتَنزِيلُ رَبِّ ٱلْعَٰلَمِينَ- نَزَلَ بِهِ ٱلرُّوحُ ٱلْأَمِينُ-عَلَىٰ قَلْبِكَ لِتَكُونَ مِنَ ٱلْمُنذِرِينَ- بِلِسَانٍ عَرَبِىٍّۢ مُّبِينٍ
“নিশ্চয় এ কুরআন বিশ্ব জাহানের রবের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ করা হয়েছে, বিশ্বস্ত আত্মা এটা নিয়ে অবতরণ করেছে, তোমার হৃদয়ে, যাতে তুমি সতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত হও, সুস্পষ্ট আরবি ভাষায়।” [সূরা আশ-শুয়ারা : ১৯২-৯৫]
দুই. কুরআন মানবজাতির জন্য হিদায়াত ও রহমাত : কুরআন আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে নাজিলকৃত সর্বশ্রেষ্ঠ ও চিরন্তন মু’জিযা। এতেরয়েছে মানব জীবনের সকল দিক ও বিভাগ সম্পর্কে সুস্পষ্ট হিদায়াত ও দিকনির্দেশনা, রয়েছে আলোকবর্তিকা, উপদেশ, রহমাত ও অন্তরের যাবতীয় ব্যাধির উপশম। কুরআনুল কারীমে বলা হয়েছে।
وَنَزَّلۡنَا عَلَيۡكَ الۡـكِتٰبَ تِبۡيَانًا لِّـكُلِّ شَىۡء وَّهُدًى وَّرَحۡمَةً وَّبُشۡرٰى لِلۡمُسۡلِمِيۡنَ
“আমি তোমার নিকট কিতাবটি নাজিল করেছি। এটি এমন যে তা সবকিছুর সুস্পষ্ট বর্ণনা, আর এটা হিদায়াত, রহমাত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ।” [সূরা আন-নাহল : ৮৯]
তিন. কুরআন হলো নূর বা আলো : অন্ধকারে নিমজ্বিত জাতিকে সত্যিকার আলোর দিকে নিয়ে আসার জন্য আল-কুরআন হলো আলো বা নূর। সেজন্য আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
قَدْ جَآءَكُمدْ جَآءَكُم مِّنَ ٱﻟَّﻠﻪِ نُورٌ وَكِتَٰبٌ مُّبِينٌ يَهْدِى بِهِ ٱﻟَّﻠﻪُ مَنِ ٱتَّبَعَ رِضْوَٰنَهُ سُبُلَ ٱلسَّلَٰمِ وَيُخْرِجُهُم مِّنَ ٱلظُّلُمَٰتِ إِلَى ٱلنُّورِ ﺑِﺈِذْنِهِ وَيَهْدِيهِمْ إِلَىٰ صِرَٰطٍۢ مُّسْتَقِيمٍۢ
“অবশ্যই তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে আলো ও সুস্পষ্ট গ্রন্থ এসেছে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাদেরকে শান্তির পথ দেখান, যারা তাঁর সন্তুষ্টির অনুসরণ করে এবং তাঁর অনুমতিতে তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করেন। আর তাদেরকে সরল পথের দিকে হিদায়াত দেন।” [সূরা আল-মায়িদাহ : ১৫-১৬]
চার. কুরআনের বেশ কিছু নাম রয়েছে : কুরআনের বেশ কিছু নাম রয়েছে। যেমন : হুদা- পথনির্দেশক, যিকর- উপদেশ বানী, ফুরকানসত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী, নূর-আলো ও কিতাব ইত্যাদি। কুরআনে এসেছে,
َبَارَكَ ٱلَّذِى نَزَّلَ ٱلْفُرْقَانَ عَلَىٰ عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَٰلَمِينَ نَذِيرًا
“তিনি বরকতময় যিনি তাঁর বান্দার উপর ফুরকান (সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী) নাজিল করেছেন, যেন সে জগতবাসীর জন্য সতর্ককারী হতে পারে।” [সূরা আলফুরকান : ০১]
আল-কুরআনের বৈশিষ্ট্য
এক. যাবতীয় বিকৃতি, পরিবর্তন ও পরিবর্ধন থেকে সংরক্ষিত : পৃথিবীর কোনো গ্রন্থই বিকৃতি, পরিবর্ধন ও পরিবর্তনের হাত থেকে রেহাই পায়নি। এক্ষেত্রে কুরআন মাজীদই একমাত্র ব্যতিক্রম. যা এখানে পরিবর্তন, বিকৃতি ও পরিবর্ধন হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না। কারণ এর হিফাযতকারী আল্লাহ তা‘আলা নিজেই। কুরআনুল কারীমে এসেছে,
إِﻧﺎَّ نَحۡنُ نَزّۡلنَا الذِّکۡرَ وَ إِﻧﺎَّ لَه لحَٰفِظُوۡنَ
“নিশ্চয় আমি উপদেশবাণী তথা কুরআন নাজিল করেছি এবং নিঃসন্দেহে এর হিফাযতকারী আমি নিজেই।” [সূরা আল-হিজর : ০৯]
দুই. কুরআন বিশ্ববাসীর জন্য চ্যালেঞ্জ : কুরআনের মতো কোনো কিতাব কেউ এ পর্যন্ত রচনা করতে সক্ষম হয়নি। আর কিয়ামাত পর্যন্ত তা সম্ভবও হবে না। কুরআনুল কারীমে বলা হয়েছে,
قُل لَّئِنِ ٱجْتَمَعَتِ ٱلْإِنسُ وَٱلجْنُّ عَلَىٰٓ أَن ﻳَﺄْتُو۟ا بِمِثْلِ هَٰذَا ٱلْقُرْءَانِ لَا ﻳَﺄْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيرًا
“বল, যদি মানব ও জ্বিন জাতি সবাই মিলে একত্রিত হয় যে, তারা এ কুরআন অনুরূপ কিছু আনয়ন করবে, তারা এ কুরআনের অনুরূপ কিছুই আনয়ন করতে পারবে না, যদিও তারা একে অপরের সাহায্যকারী হয়।” [সূরা ইসরা : ৮৮]
তিন. কুরআন সর্বশেষ আসমানী কিতাব : বিশ্ব জাহানের মহান অধিপতি আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে নাজিলকৃত মহাবিস্ময়কর অলৌকিক গ্রন্থ আলকুরআন সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানী কিতাব। এ বিষয়ে কুরআনের ঘোষণা হলো,
وَأَنزَلْنَآ إِلَيْكَ ٱلْكِتَٰبَ بِٱلحَْقِّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ ٱلْكِتَٰبِ وَمُهَيْمِنًا عَلَيْه
“আর আমি তোমার প্রতি কিতাব নাজিল করেছি যথাযথভাবে, এর পূর্বের কিতাবের সত্যয়নকারী ও এর উপর সংরক্ষণকারীরূপে [অর্থাৎ অন্যান্য কিতাব রহিতকারী]।” [সূরা আল-মায়িদাহ : ৪৮]
আল-কুরআন নাযিলের উদ্দেশ্য
এক. মানবজাতিকে হিদায়াত দান করা : মানুষের হিদায়াত বা পথ প্রদর্শনের জন্যে আল্লাহ তা‘আলা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রাসূল মনোনীত করেন। আর হিদায়াতের গাইডবুক হিসেবে তাঁর প্রতি নাজিল করেন আল-কুরআন। মহান আল্লাহ বলেন,
إِنَّ هَٰذَا الْقُرْآنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ وَيُبَشِّرُ الْمُؤْمِنِينَ الَّذِينَ يَعْمَلُونَ الصَّالِحَاتِ أَنَّ لَهُمْ أَجْرًا كَبِيرًا
“নিশ্চয় এ কুরআন এমন একটি পথ দেখায় যা সবচেয়ে সরল এবং যে মুমিনগণ নেক আমল করে তাদেরকে সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার।” [সূরা ইসরা : ০৯]
দুই. মানবজাতিকে সতর্ক করা : আল-কুরআন নাযিলের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো ইহকাল ও পরকাল সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক- সাবধান করা। কুরআনুল কারীমে বলা হয়েছে,
وَاُوۡحِیَ اِلَیَّ هٰذَا اۡلقُرۡاٰنُ لِاُنۡذِرَکُمۡ بِه وَ مَن بَلَغ
“আর এ কুরআন আমার কাছে ওহী করে পাঠানো হয়েছে যেন তোমাদেরকে ও যার কাছে এটা পৌঁছবে তাদেরকে এর মাধ্যমে আমি সতর্ক করি।” [সূরা আল-আনআম : ১৯
তিন. মানবজাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসা : আল-কুরআন একটি আলোকরশ্মি। এটি নৈতিক অধঃপতন ও বিভ্রান্তি থেকে মানবজাতিকে বের করে আলোর দিকে নিয়ে আসে। কুরআনুল কারীমে বলা হয়েছে,
الٓر ۚ كِتَـٰبٌ أَنزَلْنَـٰهُ إِلَيْكَ لِتُخْرِجَ ٱلنَّاسَ مِنَ ٱلظُّلُمَـٰتِ إِلَى ٱلنُّورِ بِإِذْنِ رَبِّهِمْ إِلَىٰ صِرَٰطِ ٱلْعَزِيزِ ٱلْحَمِيدِ
“আলিফ-লাম-রা; এই কিতাব, যা আমি তোমার প্রতি নাজিল করেছি, যাতে তুমি মানুষকে তাদের রবের অনুমতিক্রমে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আন, পরাক্রমশালী সর্বপ্রশংসিতের পথের দিকে।” [সূরা ইবরাহীম : ০১]
চার. দীনকে বিজয়ী করা : কুরআন নাজিলের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর দীনকে বিজয়ী করা। মহান আল্লাহ বলেন,
هُوَ ٱلَّذِىٓ أَرْسَلَ رَسُولَهُۥ بِٱلْهُدَىٰ وَدِينِ ٱلْحَقِّ لِيُظْهِرَهُۥ عَلَى ٱلدِّينِ كُلِّهِۦ وَلَوْ كَرِهَ ٱلْمُشْرِكُونَ
“তিনিই তাঁর রাসূলকে হিদায়াত ও সত্য দীন দিয়ে প্রেরণ করেছেন, যাতে তিনি সকল দীনের উপর তা বিজয়ী করে দেন। যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।” [সূরা আস-সাফ : ০৯]
আল-কুরআনের আলোচ্য বিষয়
এক. ইলমুত তাওহীদ : তাওহীদ শব্দের অর্থ একত্ববাদ, আল্লাহকে এক এবং অদ্বিতীয় হিসেবে জানা ও মানা। আর পরিভাষায় তাওহীদ হলো, বান্দাকে সুনিশ্চিতভাবে জানা ও স্বীকার করা যে, আল্লাহ তা‘আলা এককভাবে সকল বস্তুর মালিক ও প্রতিপালক। সকল কিছুর তিনিই সৃষ্টিকর্তা, সমগ্র বিশ্বকে তিনিই এককভাবে পরিচালনা করছেন, (তাই) একমাত্র তিনিই সকল ইবাদাত-উপাসনার উপযুক্ত, এতে তাঁর কোনো শরীক ও অংশীদার নেই। তিনি ভিনড়ব সকল উপাস্য বাতিল ও অসত্য। তিনি সর্বোতভাবে যাবতীয় পরিপূর্ণ গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। সকল প্রকার দোষ ও অপূর্ণাঙ্গতা থেকে মুক্ত ও পবিত্র।
তাওহীদ সম্পর্কে বিভিন্ন জায়গায় আলোচনা করা হয়েছে। যেমন : কুরআন হাকীমে এসেছে,
إِﻳَّﺎكَ نَعۡبُدُ وَإِﻳَّﺎكَ نَسۡتَعِينُ
“আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদাত করি এবং তোমার নিকটই সাহায্য প্রার্থনা করি।” [সূরা ফাতিহা : ০৫] দুই. ইলমুর রিসালাহ : আল্লাহ তা‘আলা মানব জাতির হিদায়াতের জন্য যুগে যুগে নবী ও রাসূল প্রেরণ করেছেন। আর কুরআন মাজীদে এ বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে এভাবে,
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اﻟَّﻠﻪَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ
“আর আমি যুগে যুগে প্রত্যেক রাসূল প্রেরণ করেছি যে, তারা এক আল্লাহর দাসত্ব করবে এবং তাগুতকে ত্যাগ করবে।”[সূরা নাহল : ৩৬]
তিন. ইলমুদ দীন : দীন হচ্ছে জীবন পরিচালনার পথ নির্দেশনা। আর সেটি হলো ইসলাম। কুরআন মাজীদে ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
اِنَّ الدِّيۡنَ عِنۡدَ اللّٰهِ الۡاِسۡلَامُ
“নিশ্চয় আল্লাহর নিকট দীন হচ্ছে ইসলাম।” [সূরা আলে ইমরান : ১৯]
চার. ইলমুত তারিখ : কুরআনুল কারীমে অতীতের নবী-রাসূলদের ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। বর্ণনা রয়েছে নানা শিক্ষণীয় বিষয়ের। যাতে মানব জাতি অতীত ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে পারে। কুরআনুল কারীমে বলা হয়েছে,
نَحْنُ نَقُصُّ عَلَيْكَ أَحْسَنَ ٱلْقَصَصِ بِمَآ أَوْحَيْنَآ إِلَيْكَ هَٰذَا ٱلْقُرْان
“আমি তোমার নিকট সুন্দরতম কাহিনী বর্ণনা করছি, এ কুরআন আমার ওহী হিসেবে তোমার কাছে প্রেরণ করার মাধ্যমে।”[সূরা ইউসুফ : ০৩]
পাঁচ. ইলমুল আখিরাহ : কুরআনে রয়েছে আখিরাতের জ্ঞান। যেমন মৃত্যু, কিয়ামত, জানড়বাত ও জাহানড়বাম ইত্যাদি। ইলমুল আখিরাহ সম্পর্কে কুরআন মাজীদে এসছে,
وَٱلْٔاخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَىٰ-بَلْ تُؤْثِرُونَ ٱلحَيَوٰةَ ٱلدُّنْيَا
“বরং তোমরা দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দিচ্ছ। অথচ আখিরাত সর্বোত্তম ও স্থায়ী।” [সূরা আলা : ১৬-১৭]
ছয়. ইলমুদ দুনিয়া : ইলমুদ দুনিয়া বলতে দুনিয়াতে জীবন-যাপনের জন্য যে সকল বিদ্যার প্রয়োজন, সে সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। যেমন : ব্যবসা-বাণিজ্য, লেন-দেন, ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক আচরণ ইত্যাদি। এ জন্য আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
“যারা বলে, হে আমাদের রব, আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দিন। আর আখিরাতেও কল্যাণ দিন এবং আমাদেরকে আগুনের আযাব থেকে রক্ষা করুন।” [সূরা বাক্বারাহ : ২০১]
আল-কুরআন শিক্ষার গুরুত্ব
এক. কুরআন শিক্ষা ফরয : যে ব্যক্তি নিজেকে মুসলিম হিসেবে দাবি করবে তাকে অবশ্যই কুরআন শিক্ষা করতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা কুরআন শিক্ষা করা ফরয করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, اقْرَأْ ﺑِﺎسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَق “পড় তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।” [সূরা আল-আলাক : ১] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন শিক্ষার নির্দেশ দিয়ে বলেন,
تعلموا القران واتلوهتعلموا القران واتلوه
“তোমরা কুরআন শিক্ষা কর এবং তিলাওয়াত কর।” [মুসনাদ আলজামি : ৯৮৯০]
দুই. হিদায়াত লাভের জন্য কুরআন শিক্ষা : আলকুরআন আসমানী কিতাবসমূহের মধ্যে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব। ইহা কিয়ামাত পর্যন্ত সকল মানুষের জন্য একমাত্র হিদায়াত-পথনির্দেশক। তাই হিদায়াত লাভের জন্য কুরআন শিক্ষা করতে হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন,
يَّهۡدِیۡ بِهِ اﻟّٰﻠﻪُ مَنِ اتَّبَعَ رِضۡوَانَه سُبُلَ السَّلٰمِ وَ يُخۡرِجُهُمۡ مِّنَ الظُّلُمٰتِ اِلَی النُّوۡرِ ﺑِﺎِذۡنِه وَ يَهۡدِيۡهِمۡ اِلٰی صِرَاطٍ مُّسۡتَقۡيم
“এর মাধ্যমে [আলকুরআন] আল্লাহ তাদেরকে শান্তির পথ দেখান, যারা তাঁর সন্তুষ্টির অনুসরণ করে এবং তাঁর অনুমতিতে তিনি তাদেরকে অন্ধকার খেকে আলোর দিকে বের করেন। আর তাদেরকে সরল পথের দিকে হিদায়াত দেন।” [সূরা আল-মায়িদাহ : ১৬]
তিন. সালাত আদায়ের জন্য কুরআন শিক্ষা : আল্লাহ তা‘আলা ঈমানদারদের উপর প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় ফরয করেছেন। কুরআন তিলাওয়াত ছাড়া সালাত আদায় হয় না। এ বিষয়ে কুরআনের ঘোষণা, فَاقْرَءُوا مَا تَيَسَّرَ مِنْ اۡلقُرۡاٰن “অতএব তোমরা কুরআন থেকে যতটুকু সহজ ততটুকু পড়।” [সূরা আল-মুযযাম্মিল : ২০]
হিফযুল কুরআনের গুরুত্ব ও ফযিলাত
এক. কুরআন হিফযের কারণে জানড়বাতে উচ্চ মর্যাদা লাভ : যারা কুরআন হিফয করেছেন এবং হাফিয হওয়ার পর কুরআন শিক্ষার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন, তারা সর্বোত্তম ব্যক্তি। আল্লাহ তা‘আলা কুরআন হিফযের কারণে হাফিযদের জানড়বাতে সুউচ্চ মর্যাদা দান করবেন। এ বিষয়ে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
يقُالُ لِصَاحِبِ الْقُرْآنِ اقْرَأْ وَارْتَقِ وَرَتّلْ كَمَا كُنْتَ تُ رَتّلُ فِي الدُّنْيَا فَإِنَّ مَنْزِلَتَكَ عِنْدَ آخِرِ آيَةٍ تَقْرَأُ ﺑِﻬَا
“(কিয়ামতের দিন) কুরআনের হাফেযকে বলা হবে কুরআন পড়ে যাও, আর উপরে উঠতে থাক, ধীরস্থিরভাবে তারতীলের সাথে পাঠ কর, যেমন দুনিয়াতে তারতীলের সাথে পাঠ করতে। কারণ তোমার অবস্থান সেখানেই হবে, যেখানে তোমার আয়াত পড়া শেষ হয়।” [সুনান আততিরমিযী : ২৯১৪, হাসান সহীহ]
দুই. হাফেযগণ দাজ্জালের ফিতনাহ থেকে মুক্ত : কিয়ামতের আগে আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়ার সমস্ত মানুষকে দাজ্জালকে দিয়ে পরীক্ষা করবেন। এ দাজ্জাল মানুষকে ফিতনার মধ্যে ফেলে দিবে। কিন্তু হাফেযগণ দাজ্জালের ফিতনাহ থেকে মুক্ত থাকবে। এজন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَنْ حَفِظَ عَشْرَ آﻳَﺎتٍ مِنْ أَوَّلِ سُورَةِ الْكَهْفِ عُصِمَ مِنَ الدَّجَّال
“যে ব্যক্তি সূরা কাহাফের প্রম থেকে দশটি আয়াত মুখস্থ করবে তাকে দাজ্জাল থেকে নিরাপদ রাখা হবে।” [সহীহ মুসলিম : ১৯১৯]
তিন. হিফয করার মাধ্যমে সাওয়াব অর্জনের বিরাট সুযোগ : কুরআন সংরক্ষণের ধারাবাহিকতায় আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদেরকে হাফিয হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। হাফিযগণ কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অনেক সাওয়াব লাভ করে থাকেন। আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ للهِ فَلَهُ بِهِ حَسَنَةٌ وَالحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهاَ لَا أَقُولُ الم حَرْفٌ وَلَكِنْ أَلِفٌ حَرْفٌ وَلَامٌ حَرْفٌ وَمِيمٌ حَرْفٌ
“যে ব্যক্তি কুরআনের একটি হরফ পাঠ করে, তাকে একটি নেকি প্রদান করা হয়। প্রতিটি নেকি দশটি নেকির সমান। আমি বলি যে, আলিফ-লাম-মীম একটি হরফ, বরং আলিফ একটি হরফ, লাম একটি হরফ ও মীম একটি হরফ।” [সুনান আত তিরমিযি : ২৯১০, সহীহ]
আল-কুরআনের হক
এক. কুরআন শিক্ষা করা ও শিক্ষা দেওয়া : কুরআন শিক্ষা করা ফরয। কুরআন শিক্ষা করা এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে, কোনো মুসলিম তা শিখতে না পারলে আখিরাতে তাকে কঠিন আযাবের সম্মুখীন হতে হবে। এ কুরআন শিক্ষা করা ও শিক্ষা দেওয়া সর্বোত্তম কাজ। এজন্য হাদীসে এসেছে,
عَنْ عُثْمَانَ رَضِيَ للهُ عَنْهُ عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى للهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ خَيْرُكْمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمَه
“উসমান রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সেই, যে নিজে কুরআন শিক্ষা করে ও অপরকে শিক্ষা দেয়।” [সহীহ বুখারী : ৫০২৭] দুই. কুরআন বুঝা ও উপলব্ধি করা : কুরআনের অর্থ বুঝা ও অনুধাবন করা কুরআনের অন্যতম হক। কুরআন থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য অবশ্যই তা বুঝতে হবে। না বুঝে পড়লে কুরআনের আসল মজা পাওয়া যাবে না। কুরআনুল কারীমে বলা হয়েছে.
“উসমান রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সেই, যে নিজে কুরআন শিক্ষা করে ও অপরকে শিক্ষা দেয়।” [সহীহ বুখারী : ৫০২৭]
দুই. কুরআন বুঝা ও উপলব্ধি করা : কুরআনের অর্থ বুঝা ও অনুধাবন করা কুরআনের অন্যতম হক। কুরআন থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য অবশ্যই তা বুঝতে হবে। না বুঝে পড়লে কুরআনের আসল মজা পাওয়া যাবে না। কুরআনুল কারীমে বলা হয়েছে.
اِﻧﺎَّۤ اَنۡزَلنٰہُ قُرۡءٰﻧﺎً عَرَبِيًّا لَّعَلَّکُمۡ تَعۡقِلُوۡن
“নিশ্চয় আমি একে আরবি কুরআনরূপে নাজিল করেছি যাতে তোমরা বুঝতে পার।” [সূরা ইউসূফ : ০২]
তিন. কুরআন অনুযায়ী আমল করা : কুরআনের আমল করার অর্থ কুরআনের অনুসরণ করা, কুরআন অনুযায়ী নিজের জীবনকে গড়ে তোলা। কুরআন মূলত অনুসরণ এবং তাঁর নির্দেশ মোতাবেক আমল করার জন্যই নাজিল করা হয়েছে। এ বিষয়ে কুরআনে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে,
اِتَّبِعُوۡا مَاۤ اُنۡزِلَ اِلَيکُمۡ مِّنۡ رَّبِّکُمۡ وَلَا تَتَّبِعُوۡا مِنۡ دُوۡنِ اَوۡلِيَآء قَلِيلًا مَّا تَذَکَّرُوۡنَ
“তোমাদের প্রতি তোমাদের রবের পক্ষ থেকে যা নাজিল করা হয়েছে, তা অনুসরণ কর এবং তাকে ছাড়া অন্য অভিভাবকের অনুসরণ করো না। তোমরা সামান্যই উপদেশ গ্রহণ কর।” [সূরা আল-আরাফ : ০৩]
চার কুরআন প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করা : কুরআনের প্রচার, প্রসার ও তা প্রতিষ্ঠার কাজ করা কুরআনের অন্যতম হক। কুরআন শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন, কুরআনের প্রতিযোগিতা, মাকতাব চালু করা, মুয়াল্লিম তৈরি করা, কুরআনের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার কাজে সহযোগিতা করা এ কাজের অন্তর্ভুক্ত। সর্বোপরি সমাজে কুরআনের বিধান প্রতিষ্ঠার কাজ করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন,
يَٰٓأَيُّهَا ٱلرَّسُولُ بَلِّغْ مَآ أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ
“ হে রাসূল, তোমার রবের পক্ষ থেকে তোমার নিকট যা নাজিল করা হয়েছে, তা পৌঁছে দাও।” [সূরা আল-মায়িদাহ : ৬৭]
আল-কুরআনের হক আদায় না করার পরিণতি
এক. রাসূলের অভিযোগ পেশ : কিয়ামতের ভয়াবহ অবস্থায় আল্লাহ তা‘আলার অনুমতিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মাতের জন্য শাফায়াত চাইবেন। কিন্তু যারা কুরআনের যেসব হক রয়েছে তা আদায় করেনি, কিয়ামতের দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর দরবারে অভিযোগ পেশ করবেন। কুরআনে এসেছে,
وَقَالَ الرَّسُوۡلُ يٰرَبِّ اِنَّ قَوۡمِی اتَّخَذُوۡا هٰذَا اۡلقُرۡاٰنَ مَهۡجُوۡرًا
“আর রাসূল বলবেন, হে আমার রব, নিশ্চয় আমার কওম এ কুরআনকে পরিত্যাজ্যগণ্য করেছে।” [সূরা আল-ফুরকান : ৩০]
দুই. কিয়ামতে অন্ধ হয়ে উঠবে : যে কুরআনের শিক্ষা থেকে বিমুখ হয়ে থাকল, সে কিয়ামতে অন্ধ হয়ে উঠবে বলে কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَى - قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرْتَنِي أَعْمَى وَقَدْ كُنْتُ بَصِيرًا
قَالَ كَذَلِكَ أَتَتْكَ آﻳَﺎتنُا فَنَسِيتَهَا وَكَذَلِكَ الْيَوْمَ تنُسَى
“আর যে আমার যিক্র (কুরআন) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, নিশ্চয় তার জীবন-যাপন হবে সংকুচিত এবং আমি কিয়ামতের দিন তকে অন্ধ অবস্থায় উঠাবো। সে বলবে, হে আমার রব, কেন আপনি আমাকে অন্ধ অবস্থায় উঠালেন? অথচ আমি তো ছিলাম দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন? তিনি বলবেন, অনুরূপভাবে তোমার নিকট আমার আয়াতসমূহ এসেছিল, অতঃপর তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে এবং সেভাবেই আজ তোমাকে ভুলে যাওয়া হলো।” [সূরা ত্বাহা : ১২৪-১২৬]
তিন. কুরআন দলিল হিসেবে আসবে : কুরআন শিক্ষা থেকে বিরত থাকার কারণে কুরআন তার বিপক্ষের দলিল হিসেবে উপস্থিত হবে। মালিক আশআরী রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
والقرآن حجة لك أو عليك
“কুরআন তোমার পক্ষে কিংবা বিপক্ষের দলিল।” [সহীহ মুসলিম : ৩২৮ ]
চার. জাহানড়বামে যাওয়ার কারণ হবে : যে ব্যক্তি কুরআন অনুযায়ী জীবন যাপন করবে না; কুরআনের অনুসরণ ও অনুকরণ করবে না; কুরআন তাকে জাহানড়বামে নিক্ষেপ করবে। এ বিষয়ে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
القرآن مشفع ، وماحل مصدق ، من جعله أمامه قادة إلى الجنة ، ومن جعله خلف ظهره ساقه إلى النار
“কুরআন সুপারিশকারী এবং তাঁর সুপারিশ গ্রহণযোগ্য। সুতরাং যে ব্যক্তি কুরআনকে সামনে রেখে তাঁর অনুসরণ করবে, কুরআন তাকে জানড়বাতে নিয়ে যাবে। আর যে ব্যক্তি একে নিজ পশ্চাতে রেখে দেবে, কুরআন তাকে জাহানড়বামে নিক্ষেপ করবে।” [সহীহ ইবনে হিব্বান : ১২৪]
উপরিউক্ত আলোচনার মাধ্যমে আলকুরআন সম্পর্কে সংক্ষিপ্তভাবে জানতে পারলাম। প্রকৃতপক্ষে আরো ব্যাপকভাবে জানতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে এই কিতাব সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান হাসিল করার তাওফীক দিন। আমীন!
وآخر دعواﻧﺎ أن الحمد ﻟﻠﻪ رب العالمين